বুধবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৩


স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? 




যেই বিষয়টা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করবো তা হচ্ছে আল্লাহ এবং আল্লাহর সৃষ্টি ।

১ম অংশ

নাস্তিকরা যখন বিভিন্ন ভ্রান্ত তত্ত্ব দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে যে মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে, পৃথিবী সৃষ্টিতে এবং আমাদের (মানুষ) সৃষ্টিতে কোন স্রষ্টার প্রয়োজন নেই, এবং ব্যর্থ হয়। তখন বিশ্বাসীকে প্রশ্ন করে বসে- স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? কারণ বিশ্বাসীকে গায়েল করার জন্য নাস্তিকদের এটা প্রধান ও শেষ হাতিয়ার। আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিসরে যুক্তি ও তথ্য উপাত্তার মাধ্যমে তাদের এই হাতিয়ারে আঘাত করতে চাই বিজ্ঞানের আলোকে।

আর আমরা বিজ্ঞান বলতে সরল ভাবে যা বুঝি তাহল পদার্থ বিদ্যা*। আর পদার্থ বিদ্যা যে যে ভিত্তিগুলোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, তাদের অন্যতম একটি হল নিত্যতার সূত্র। যেমন- ভরের নিত্যতার সূত্র, শক্তির নিত্যতার সূত্র। পদার্থ বিদ্যার প্রথমে ধারণা ছিল- বস্তুর ভর অবিনশ্বর, সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই। কিন্তু আইনস্টানের E=mc² সূত্র ভরের নিত্যতার সূত্রে আঘাত হানে। যার ব্যবহারিক প্রমাণ মেলে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পারমানবিক বোমা বিষ্ফোরনের মধ্যমে। এই ভয়ঙ্কর বিষ্ফোরনে এটাই প্রমাণিত হল ভর নষ্ট হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তারপর ভরের নিত্যতার সূত্র রূপ নেয় শক্তির নিত্যতার সূত্র হিসেবে (শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই)। আর এই নিত্যতার সূত্র পদার্থ বিদ্যার অন্যতম ভিত্তি কেন? কেন-ই বা এই নিত্যতার সূত্রের প্রয়োজন।
কারণ আপনার, আমার, আমাদের চারপাশের যা কিছুই আছে পৃথিবী সমেত সমগ্র মহাবিশ্ব (বস্তু জগত), অর্থাৎ অস্তিত্বশীল সকল কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য প্রথমে প্রয়োজন এমন একটা কিছু, যার কোনো সৃষ্টি নাই। সৃষ্টি ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকলেই কেবল প্রমাণ করা সম্ভব আপনার, আমার, সব কিছুর অস্তিত্ব আছে। তা-না হলে কোন ভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব নয় আপনার, আমার অস্তিত্বের কথা। সুতরাং আপনার, আমার আস্তিত্ব যখন আছে, তখন অবশ্যই ধরে নিতে হবে, এমন একটা কিছু অবশ্যই আছে যার কোনো সৃষ্টি নেই। তাহলেই স্বপ্রমাণ বস্তু জগতের অস্তিত্বের।
একই ভাবে পদার্থ বিদ্যার অস্তিত্ব আছে প্রমানের জন্য প্রয়োজন শক্তির নিত্যতার সূত্রের। আমরা যদি শক্তি সম্পর্কে আরো ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করতে পারি, এবং দেখি যে শক্তিও কোন উrস থেকে সৃষ্টি, সেই দিন শক্তির নিত্যতার সূত্র রূপ লাভ করবে- শক্তির সৃষ্ট উৎসের নিত্যতার সূত্র হিসেবে। তারপরও প্রয়োজন নিত্যতার সূত্রের, প্রয়োজন এমন কিছুর যার সৃষ্টি নেই ও চিরকাল ধরে ছিল। অতএব সব কিছুরই সৃষ্টির প্রশ্ন করা যায় না। এক পর্যায়ে গিয়ে থামতেই হবে এই সৃষ্টির প্রশ্নের ব্যাপারে।
যেমন পদার্থ বিদ্যা গিয়ে থেমেছে শক্তির সৃষ্টির প্রশ্নের কাছে। অর্থাৎ- শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নাই। এই মহাবিশ্বে শক্তির পরিমান ধ্রুব। শক্তি এক বা একাদিক রূপে রূপান্তরিত হতে পারে, যার ফল স্বরূপ মহাবিশ্বের সকল অস্তিত্ব।

তাহলে নাস্তিকবাদ এই প্রশ্ন করতে পারে না- স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? আর বিশ্বাসীরা স্রষ্টা পর্যন্ত গিয়ে থেমে যান সৃষ্টির প্রশ্নের ব্যাপারে। এটা প্রয়োজন আস্তিকদের নিজের অস্তিত্ব প্রমানের জন্য। কারণ কোন অস্তিত্বশীল-ই চাইবেনা এটা যে, আমার অস্তিত্ব নাই (অস্তিত্বশীল থাকা স্বত্বেও)।

২য় অংশ

স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল এর ১ম অংশে বিজ্ঞান ও যুক্তির মাধ্যমে উত্তর দেওয়ার প্রয়াস করেছি। ২য় অংশে কুরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
পাঠকের অবগতির জন্য বলছি, আমি একজন তুচ্ছ জ্ঞানের সাধারণ মানুষ। ভূল ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, এবং যুক্তি যুক্ত মনে হলে গ্রহন করবেন। তবে মহান আল্লাহ সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যাই চুড়ান্ত এটা ভাববেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতালা বলেন- তাঁর অনন্ত জ্ঞানের কোন বিষয়ই কেউ আয়ত্ব করতে পারে না (২:২৫৫)। অর্থাৎ মানুষ আমার সম্পর্কে তুচ্ছ জ্ঞানই লাভ করতে পারবে (আল কোরআন)। নিম্মে কয়েকটি গুরুত্ব পূর্ণ আয়াত দেওয়া হল যে গুলো আল্লাহ তালার অস্তিত্বের প্রকাশ করবে -

(আল্লাহ)! তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত- তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত (৫৭:৩)।

ইহার (সৃষ্টির) উপর অবস্থিত যাবতীয় বস্তু ধ্বংসের অধীন। শুধু তোমার সম্মানিত প্রভুর সত্ত্বা লয়হীন ও অনন্তস্থায়ী(৫৫:২৬-২৭)।

আল্লাহর অস্তিত্ব ব্যতীত সমস্ত কিছুই নিঃশেষে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে(২৮:৮৮)।

আল্লাহ! তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব.....(২:২৫৫)।

তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই... (২৮:৭০)।

তিনিই আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, তাঁর সন্তান হইবে কিরূপে (৬:১০১)।

আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ নাই এবং তাহার সহিত অপর কোন উপাস্য নাই (২৩:৯১)।

বল- আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি।
এবং কেহই তাঁর সমকক্ষ নয় (১১২:১-৪)।

শক্তির সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই তুচ্ছ, শক্তির নিত্যতার সূত্র ছাড়া এর সম্পর্কে বেশি কিছু জানা নেই। তবে ধারনা করা হয় ফোটন কণা সহ, মৌলিক বল সৃষ্টিকারি বিভিন্ন চক্রণ বিশিষ্ট্য ফোটন কণা গুলো শক্তির গুচ্ছ বা প্যাকেট। অর্থাৎ শক্তি কোনো তথ্য* দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে গুচ্ছ আকারে ফোটন কণা সহ মৌলিক কণা গুলো সৃষ্টি করে। আর এই ফোটন কনা গুলোই সৃষ্টি করে পদার্থের প্রথম ভিত্তি কোয়ার্ক। কারণ কোয়ার্ক পর্যন্ত কণাগুলো কে পদার্থ হিসেবে ধরা যায়। ফোটন কণাগুলো হল আলোক কণা বা বিভিন্ন বলবহী কণা। কোয়ার্ক ৬ ধরণের, এই কোয়ার্ক গুলোই পরমানুর মূল ভিত্তি ৩টি স্থায়ী কণিকা- ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন সৃষ্টি করে। ফোটন কণা সম্পর্কে আমদের যথেষ্ট জ্ঞান থাকলে ও, তারপর (শক্তি সম্পর্কে) আমাদের অর্জন শূন্যের কোটায়। যেহেতু ফোটন কণার পর শুধু শক্তির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সুতরাং শক্তিই হল সব কিছুর আদি ভিত্তি, এবং কোন অস্তিত্ব (পদার্থ) ধ্বংসের পর শক্তিতে পরিনত হয়, তাই শক্তিই হল অন্ত। শক্তি সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানি তাহল- শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নাই। এই মহাবিশ্বে শক্তির পরিমান ধ্রুব। শক্তি এক বা একাদিক রূপে রূপান্তরিত হতে পারে, যার ফল স্বরূপ মহাবিশ্বের সকল অস্তিত্ব। এবার আপনার সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে কুরআনের- ৫৭:৩, ৫৫:২৬-২৭, ২৮:৮৮, ২:২৫৫, ২৮:৭০, ৬:১০১, ২৩:৯১ ও ১১২:১-৪ নং আয়াত গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। দেখবেন শক্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানের ধারনা ও আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে আল্লাহর ভাষ্য একেবারে হুবহু মিলে যাচ্ছে।

৫৭:৩ নং আয়াতে আল্লাহ আদি ও অন্ত, ৫৫:২৭ নং আয়াতে আল্লাহর সত্ত্বা লয়হীন ও অনন্তস্থায়ী এবং ২:২২৫ নং আয়াতে আল্লাহ চিরঞ্জীব সত্ত্বা বলে দাবি করেছেন। ৫৫:২৬, ২৮:৮৮ নং আয়াতে বলাহয়েছে আল্লাহর অস্তিত্ব ব্যতীত সমস্ত কিছুই নিঃশেষে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে অথবা ধ্বংসের অধীন। এর আলোকে আমরা বলতে পারি- আল্লাহর সৃষ্টি বা ধ্বংশ নাই।

২৮:৭০, ৬:১০১, ২৩:৯১ ও ১১২:১-৪ নং আয়াতের প্রেক্ষিতে আল্লাহ একক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বার দবিদার। এবং ১১২:৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি (জন্ম গ্রহণ ও জন্ম দান), অর্থাr এখানে এটাই নির্দেশ করে যে আল্লাহর সত্ত্বা ধ্রুব। কারণ আল্লাহ জন্ম গ্রহণ করলে আল্লাহর সত্ত্বা ধ্রুব থাকত না, অনুরূপ ভাবে তিনি কাউকে জন্ম দিলেও।

(প্রথমে-ই, যদি ভূল ব্যাখ্যা করে থাকি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রর্থনা করছি) ৫৫:২৬, ২৮:৮৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে- আল্লাহর অস্তিত্ব ব্যতীত সৃষ্টির উপর অবস্থিত যাবতীয় বস্তু নিঃশেষে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। বস্তু যে নিঃশেষে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হয় তা আমরা আগেই জেনেছি। অর্থাr কোয়ার্ক হল বস্তু জগতের সর্বশেষ অস্তিত্ব, কোয়্র্কের পর পদার্থের আর কোন অস্তত্ব থাকে না, পদার্থ হয়ে যায় শক্তি (এক অদৃশ্য সত্ত্বা)। সুতরাং শক্তিকে যদি আল্লাহর সত্ত্বা হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এখানে শক্তিকে আল্লাহর সত্ত্বা হিসেবে বিবেচনা করার পিছনে আর একটি ব্যাখ্যা হল, কুরআনে আল্লাহর যত গুলো নাম আছে সব গুলোই গুণবাচক নাম। এই গুণবাচক নাম গুলোর মধ্য কয়েকটি হল- ক্কাভিও, ক্কাদিরু, আজিজু। এই নাম গুলোর মূল শব্দ সরাসরি শক্তি বা এনার্জি কে নির্দেশ করে। অনুরুপ ভাবে আর একটি নাম হল নূর, যার অর্থ আলো। শক্তি এবং আলো দুইটিই শুধু গুণ গত অস্তিত্ব নয়, সত্ত্বা গত অস্তিত্ব্ বটে। মহান আল্লাহ হয়তো এখানে তাঁর গুণ গত বৈশিষ্ট্যর পাশাপাশি সত্ত্বা গত বৈশিষ্ট্যর কথাও বলেছেন। যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন সমগ্র সৃষ্টি জগত। তাই বস্তু জগত ধ্বংশ হয়ে তাঁর সত্ত্বায় বিলীন হয়ে যায়। ইহার (সৃষ্টির) উপর অবস্থিত যাবতীয় বস্তু ধ্বংসের অধীন। শুধু তোমার সম্মানিত প্রভুর সত্ত্বা লয়হীন ও অনন্তস্থায়ী(৫৫:২৬-২৭)। তাহলে আমরা বলতে পারি,

মহান স্রষ্টার সৃষ্টি বা বিনাশ নাই। তিনি চিরকাল থেকে ছিলেন এবং অনন্তকাল থাকবেন, তিনি শাস্যত চিরঞ্জীব।

পরিশেষে পাঠকের নিকট একটা প্রশ্ন, আপনি কি মনে করেন শক্তি থেকে এমনিতেই সবকিছু সৃষ্টি হওয়া সম্ভব, নাকি এর পিছনে কোন বিজ্ঞ স্রষ্টা কৃতিত্ব রয়েছে। যিনি অথবা যেখান থেকেই হোক! আমাদের ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে, তাঁকেই স্রষ্টা হিসেবে গ্রহন করতে আমাদের সমস্যা কোথায়। একটু ভেবে দেখেন সৃষ্ট হিসেবে আমরা কতই নিকৃষ্ট, স্রষ্টা কেই মেনে নিতে পারছি না।
(মহান আল্লাহ আমার (আমাদের) ধারনা থেকে অনেক উর্ধে, আমার এ তুচ্ছ জ্ঞানে তাঁর সম্পর্কে ক্ষুদ্র জ্ঞানই লাভ করতে পারব, সুস্পষ্ট ধারনা অর্জন করা কখনো সম্ভব নয়)

স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? এ আলোচনা এখানেই শেষ করলাম। পরবর্তিতে আল্লাহর কিভাবে এ সৃষ্ট জগত সৃষ্টি করলেন কোরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা করে আর্টক্যাল লিখার চেষ্টা করব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন