
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপুরো বিচারব্যবস্থার অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: টবি কেডম্যান
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে বুদ্ধিজীবী হত্যা মমলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের আইনজীবী মানবাধিকার কর্মী বৃটিশ নাইন বেড ফোর্ড রো ইন্টারন্যাশনালের এস্ট্রাডাইট (দেশে ফেরত) বিশেষজ্ঞ টবি কেডম্যান বলেছেন, আইনানুযায়ী মুঈনুদ্দীনকে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ষড়যন্ত্রে সরকার সফল হবে না।
একই সাথে তিনি বলেছেন, খুব শিগগিরই এই সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রিভিউর মাধ্যমে পুরো বিচার ব্যাবস্থার অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ১০ নম্বর ডাউনিং ষ্ট্রীটের সম্মুখে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ ৭১টি সংগঠন যৌথভাবে চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে দেশে ফেরত দেয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেন।
মানববন্ধনে মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন ভূমিকা ও হত্যা, ধর্ষণ, নারী অপহরণ, আগুন দেয়াসহ সাক্ষ্য প্রমাণসহ স্মারকলিপি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বরাবর পেশ করেন।
উল্লেখ্য, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন দাওয়াতুল ইসলাম ইউকে আই আরের সাবেক সভাপতি, বহুল পরিচিত চ্যারিটি সংগঠন মুসলিম এইডের ট্রাস্টি। এছাড়া ব্রিটিশ প্রিন্স চার্লসের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবে পরিচিত সকলের কাছে।
মুঈনুদ্দীনকে নিয়ে নানা রকম আলোচনা দেশে-বিদেশে। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কিনা- এমনই এক পরিস্থিতিতে তার আইনজীবী টবি কেডম্যানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কোন ব্রিটিশ নাগরিকের কোন দেশ তার অনুপস্থিতিতে করবে, আর বৃটেন তার নাগরিককে ওই জল্লাদদের হাতে অর্পণ করবে এটা হয় না।
তিনি বলেন, আমি আমার মক্কেলের পক্ষে মামলার পরিচালনার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে গেলে সরকার আমাকে মামলা পরিচালনা করতে না দিয়ে ফেরত আসতে বাধ্য করে। এ পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকারের মনে এই মমলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর তাছাড়া ব্রিটেন তাদের নাগরিককে কোন দেশ মৃতুদণ্ড দিলে সেক্ষেত্রে তাকে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নই উঠে না।
তিনি বলেন, আমার মক্কেলকে এমন একটা ট্রাইব্যুনাল শাস্তি দিয়েছে যা নিয়ে সারা বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার জড় বইছে। সেক্ষেত্রে তাকে ফেরত পাঠানো যায়না। তাছাড়া তিনি (মুঈন) এখন আর বাংলাদেশের নাগরিক নন। তিনি এখন সম্মানিত ব্রিটিশ নাগরিক।
মুঈনুদ্দীনকে বাংলাদেশ ফেরত নেয়ার জন্য কোন আবেদন করেছে কিনা জানকে চাইলে টবি বলেন, বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কোন আবেদন করেনি-এটা আমি নিশ্চিত।
তিনি বলেন, আন্ডার দ্য এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট-২০০৩ অনুযায়ী যতক্ষণ বাংলাদেশ কোন আবেদন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনভাবে দেশে ফেরত নেয়ার কথা গ্রহণযোগ্য হবে না ।
টবি বলেন, বাংলাদেশী দুজন ব্যারিস্টার বলেছেন, স্মারকলিপি দিয়ে, মানববন্ধন করেই মুঈনকে ফেরত নেয়া যাবে।আমি মনে করিনা সেভাবে সম্ভব হবে।
কেডম্যান বলেন, এ ক্ষেত্রে দুটি বাধা আছে। তাহলো-
প্রথমত, বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যে ফেরতের কোন চুক্তি নেই। এ ক্ষেত্রে একটি আইন আছে তা আবার ব্রিটিশ এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট ২০১৩। এই আইনেও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ১. যেখানে মৃত্যুদণ্ডের মতো মারাত্মক ঝুঁকি আছে, সেক্ষেত্রে ব্রিটেন তাদের নাগরিককে কখনোই হস্তান্তর করবে না।
তাছাড়া যে ট্রাইব্যুনালে ন্যায় বিচার অনুপুস্থিত, মানবাধিকারের লঙ্ঘন করে কারাগারে পাঠানো হয় সেখানে ব্রিটিশ নাগরিককে হস্তান্তর করা অনেক চ্যালেঞ্জের। যদি তা করা হয় তাহলে ইউরোপিয়ান কনভেনশন অ্যাক্টের ধারা তিনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে আইনী বাধার কারণেও আর মুঈনকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা নাই।
টবি বলেন, দ্বিতীয় কারণটি হলো যদি এধরনের কোন আবেদন বাংলাদেশ সরকার করেও, তারপরেও এতে কোন শর্ট-কাট ব্যবস্থা নেই। এছাড়া যদি ব্রিটিশ সরকার ফেরত দিতে সম্মতিও হয়, তাহলেও অনেক সময় লাগবে। বছরের পর বছর না লাগলেও মাসের পর মাসতো লাগবেই।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদি ব্রিটিশ সরকারের সাথে বিশেষ চুক্তিও করে ফেলে তারপরেও বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন অ্রাক্ট ২০১৩ এবং ইউরোপিয়ান কনভেনশন অ্যাক্ট অনুযায়ী সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, আমি আমার মক্কেলের দেশে ফেরত নিয়ে উদ্বিঘ্ন নই। আমার মক্কেল সব ধরনের আইনি পদক্ষেপের কথাই চিন্তা ভাবনা করছেন। আর তিনি সে অনুযায়ীই তার কাজ করে চলেছেন। তিনি এই মিথ্যা মামলার করণে উদ্বিঘ্ন নন।
টবি বলেন, শুধু মাত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধায়নেই ন্যায় বিচার হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার যদি আমার ক্লায়েন্টের ব্যাপারে সত্যি নিশ্চিত হয়ে থাকেন তিনি অপরাধী তাহলে আন্তর্জাতিক আইনে ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে বিচারের ব্যবস্থা করতে পারে।
তিনি বলেন, আমার মনে হয় এ সরকার তা কখনোই করবে না। অধিকার ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাথে সরকারের আচরণে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।
ইংল্যান্ডের কারাগারে সাজা কাটানোর প্রসঙ্গে টবি বলেন, এই বিষয়টি প্রথম ৯০ সালে প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল। তখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস, মেট্রোপলিটন পুলিশ, এফসিও লিগ্যাল ডিপার্টম্যান্ট মঈনুদ্দীনের ব্যাপারে কোন অভিযোগ নথি পত্রে প্রমাণিত না হওয়ায় কোন কোন অভিযোগ না করার সুপারিশ করা হয়েছিলো।
তিনি বলেন, যেহেতু তার অনুপস্থিতিতে এ রায় দেয়া হয়েছে, এমতাবস্থায় ব্রিটিশ আদালত রোল্ড আউট করতে পারে না। ডাবল জিওপার্ডিহেতু প্রসিকিউশন মঈনুদ্দীনকে ব্রিটেনের আদালতে নিয়ে বিচারের জন্য সমন জারি নাও করতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অ্যাক্টস থ্রোতে এই রায় নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি- এমন প্রশ্নের জবাবে টবি বলেন, এ রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং আন্তর্জাতিক আইন মানা হয়নি। রায় হয়েছে অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে-এটাই ফ্যাক্টস, যা অনেকভাবে সমালোচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পরপরই এটা নিয়ে পুরোপুরি রিভিউ করা হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায়। যেহেতু এই রায় এর কার্যক্রম নিয়ে অনেক সন্দেহ ও নানা অসংগতি রয়েছে। আমার বিশ্বস আমার দুই মক্কেলই(মুঈন-আশরাফ) আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সহায়তায় পরিপূর্ণ রিভিউর মাধ্যমে সম্মানের সাথে মুক্ত হবে এই সাজা থেকে।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মনে করি ট্রাইব্যুনালের পুরো বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্ন বিদ্ধ তাই এই বিচার আবার নতুন করে শুরু করা প্রয়োজন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন