মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৩

আমি আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই যে, আমি তাঁর প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।

আল্লাহর কসম। যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে, তবুও আমি এরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নই। আমি আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই যে, আমি তাঁর প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট। -সাইয়েদ কুতুব শহীদ রহিমাহুল্লাহ ।
বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রহ.)। সাইয়েদ কুতুব ১৯০৬ সালে মিসরের উস্ইউত জেলার মুশা গ্রামে কুতুব বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী ইব্রাহীম কুতুব, মায়ের নাম ফাতিমা হোসাইন ওসমান। মা যেমন ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু ও দ্বীনদার তেমনি তাঁর বাবাও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও সচ্চরিত্রবান। বাবা মায়ের পাঁচ সন্তান-সন্ততির মধ্যে সাইয়েদ কুতুব ছিলেন সবার বড়। সকল ভাইবোনই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ইসলামী জীবন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরীক হয়ে কঠোর ঈমানী পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে গোটা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণার উৎস হয়ে রইলেন। সাইয়েদ কুতুবের শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শৈশবেই তিনি কুরআন শরীফ হেফজ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষে তিনি কায়রোর তাজহিয়াতু দারুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে ঐ মাদরাসার শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি কায়রোর বিখ্যাত মাদরাসা দারুল উলুমে ভর্তি হন। তিনি ঐ মাদরাসা থেকে ১৯৩৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঐ মাদরাসায়ই অধ্যাপক নিযুক্ত হন।
 কিছুদিন অধ্যাপনা শেষে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্কুল ইন্সপেক্টর নিযুক্ত হন। আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির ওপরে অধিক জ্ঞানার্জনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করে। সেখানে দু’বছরের কোর্স সমাপ্ত করে তিনি দেশে ফিরে আসেন। সেখানে থাকাকালে তিনি বস্তুবাদী সমাজের সাথে পরিচিতি লাভ করেন। বস্তুবাদী সমাজের অবস্থা দেখে তার এ প্রত্যয় জন্মে যে, একমাত্র ইসলামী সমাজব্যবস্থাই মানব সমাজকে কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে পারে। আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পরই তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি গভীরভাবে যাচাই করতে শুরু করেন। তিনি ব্রাদারহুডের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের সাথে একমত হয়ে ১৯৫৩ সালে ঐ দলের সদস্য হন এবং দলের তথ্য ও প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।
 ১৯৪৮ সালের ৮ ডিসেম্বর নাকরাশী পাশা ইখওয়ানকে অবৈধ ঘোষণা করেন। নিষিদ্ধ হওয়ার পর এ দলের হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যাবেলা মুসলিম ব্রাদারহুড দলের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ের পাহাড় ঈমানের পথে আহবানকারী উস্তাদ হাসানুল বান্নাকে ব্রাদারহুড-এর কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে প্রকাশে শহীদ করা হয়। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে মিসরে এক সামরিক বিপ্লব ঘটে এবং ঐ বছরই ইখওয়ান পুনরায় বহাল হয়ে যায় এবং ইখওয়ানুল হোদাইবী দলের মোর্শেমে আম নির্বাচিত হন। সাইয়েদ কুতুব দলের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য মনোনীত হন এবং দলের আদর্শ প্রচার ও আন্দোলনের সম্প্রসারণ তার পরিচালনাধীনে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৫৪ সালে সাইয়েদ কুতুবকে ইখওয়ান পরিচালিত সাময়িকী-ইখওয়ানুল মুসলিমিন-এর সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তার সম্পাদনা দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পরেই কর্নেল নাসের সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। কারণ ঐ বছর মিসর সরকার বৃটিশের সঙ্গে নতুন করে যে চুক্তি সম্পাদন করেন ঐ পত্রিকা তার কঠোর সমালোচনা করে।
পত্রিকা বন্ধ করে দেয়ার পর নাসের সরকার ইখওয়ান কর্মীদের উপর কঠোর নির্যাতন শুরু করে এবং এক বানোয়াট হত্যা-ষড়যন্ত্র মামলার অভিযোগ এনে দলটিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয় এবং দলের নেতাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় সাইয়েদ কুতুবকেও।
হাজার হাজার লোককে জেলে ঠেলে দেয়া হয় এবং তাদের উপর জুলুম-নির্যাতনের এমন চরম স্টিম রোলার চালান হয়, যা দেখে মানব ইতিহাসের কালো অধ্যায়ও কেঁপে ওঠে। অবশেষে ছয়জন নেতার মৃত্যুদন্ড দেয়ার মাধ্যমে এই নির্মম ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে। গ্রেফতারের সময় সাইয়েদ কুতুব ভীষণভাবে জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। সামরিক অফিসার তাকে ঐ অবস্থায় গ্রেফতার করে এবং হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে দেয়। এ অবস্থায় তাঁকে কোন গাড়িতে না চড়িয়ে জেল পর্যন্ত হেঁটে যেতে বাধ্য করা হয়। অত্যধিক অসুস্থতার কারণে চলতে গিয়ে তিনি বার বার বেহুশ হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি উচ্চারণ করতেন : আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। জেলে প্রবেশ করার সাথে সাথে হিংস্র জেল কর্মচারীরা তাকে নির্মমভাবে মারপিট করতে থাকে এবং দুঘণ্টা ধরে এ অত্যাচার চলতে থাকে। এতেই শেষ নয়, বর্বর জালেমরা তাঁর ওপর একটি প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দেয়। কুকুরটি তাঁর পা কামড়ে ধরে জেলের আঙ্গিনায় টেনে নিয়ে বেড়াতে থাকে। এর পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি নির্জন কক্ষে। সেখানে তাকে একটানা সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রক্তাক্ত বেদনায় জর্জরিত শরীর এসব শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করার মতো ছিল না। কিন্তু ঈমানের বলে বলীয়ান পাহাড়ের মতো অবিচল মর্দে মুজাহিদ এসব অমানুষিক অত্যাচার অকাতরে সহ্য করেন। এ অবস্থায় তাঁর মুখে উচ্চারিত হতে থাকত আল্লাহ আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। কয়েকখানার এক সাথী সাইয়েদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, হাসপাতালের নিকট দিয়ে তিনি ধীর কদমে এগুচ্ছিলেন। তাঁর প্রশস্ত কপাল থেকে অন্তরের স্বস্তি স্পষ্ট ঝিলিক মারছিল। চোখের চমক থেকে ঝরে পড়ছিল নূরের ধারা। তিনি এমনভাবে টেনে টেনে মাটির উপর পা ফেলেছিলেন, যেন তা শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। পায়ের অস্বাভাবিক ফুলা জল্লাদের নিষ্ঠুরতার জন্য যেন আর্তনাদ করছিল। তাঁর ওপরে চালানো বিভীষিকাময় নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ইউসুফ আল আযম লিখেছেন, ‘‘সাইয়েদ কুতুবের ওপর বর্ণনাতীত নির্যাতন চালানো হয়। আগুন দ্বারা সারা শরীর ঝলসে দেয়া হয় পুলিশের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান রক্তাক্ত করা হয়। মাথার ওপর কখনো টগবগে গরম পানি ঢালা হতো। পরক্ষণে আবার খুবই শীতল পানি ঢেলে শরীর বরফের মতো ঠান্ডা করা হতো। পুলিশ লাথি, ঘুষি মেরে একদিক থেকে অন্য দিকে নিয়ে যেত।’’ এভাবে নির্মম নির্যাতনের ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৫৫ সালের ২ মে তাকে সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঐ বছরের ১৩ জুলাই মহকুমাতুস সাব অর্থাৎ জাতীয় আদালতে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে। পরে এ দন্ড বাতিল করে তাঁকে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। এক বছর কারাভোগের পর সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয় যে, তিনি যদি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ক্ষমার আবেদন করেন, তাহলে তাঁকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। এ প্রস্তাবের জওয়াবে তিনি বলেন, ‘‘আমি এ প্রস্তাব শুনে অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত হচ্ছি যে, মজলুমকে জালিমের নিকট ক্ষমার আবেদন জানাতে বলা হচ্ছে। খোদার কসম। যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে, তবুও আমি এরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নই। আমি আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই যে, আমি তাঁর প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।“ পরবর্তীকালে যতবারই তাঁকে ক্ষমা প্রার্থনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে, ততবারই তিনি এই বলে জওয়াব দিয়েছেন, ‘‘যদি আমাকে যথার্থই অপরাধের জন্য কারারুদ্ধ করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি এতে সন্তুষ্ট আছি। আর যদি বাতিল শক্তি আমাকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে থাকে, তাহলে আমি কিছুতেই বাতিলের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো না।’’ এর পরে সরকার পক্ষ থেকে প্রলোভন দেখানো হলো যে, যদি তিনি সম্মত হন তাহলে তাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হবে। সাইয়েদ এ প্রস্তাবের জওয়াবে বললেন, “আমি দুঃখিত। মন্ত্রিত্ব গ্রহণ আমার পক্ষে সে সময় পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত মিসরের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামী ছাঁচে ঢেলে সাজাবার এখতিয়ার দেয়া না হবে।” জেলখানায় তাঁর ওপরে চালানো হয় জাহেলী যুগের চেয়েও কঠিন নির্যাতন। এমনও হয়েছে যে, একাধারে চার দিন তাকে একই চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে, কোন খাবার-পানীয় দেয়া হয়নি। তাঁর সামনেই অন্যরা উল্লাস করে পানি পান করতো অথচ তাঁকে এক গ্লাস পানিও দেওয়া হতো না। হায়রে নিষ্ঠুরতা। সাইয়েদ কুতুব ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তাররা কারাগারে ছিলেন। ১৯৬৪ সালে ইরাকের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম আরিফ কায়রো সফর করেন। ইরাকী আলেমদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইরাকী প্রেসিডেন্ট জামাল নাসেরের সাথে বৈঠককালে সাইয়েদ কুতুবকে মুক্তি প্রদানের অনুরোধ জানান। তাঁর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সাইয়েদ কুতুবকে মুক্তি প্রদান করা হয়। কর্নেল নাসের তাকে মুক্তি দিয়ে অত্যন্ত কড়া নজরদারিতে তারই বাসভবনে অন্তরীণাবদ্ধ করেন। সাইয়েদ কুতুবকে জেল থেকে মুক্তি দেয়ার কারণে মিসরের কমিউনিস্ট গোষ্ঠী এবং তাদের মুরববীরা নাখোশ হয়। শুরু হয় কর্নেল নাসেরের ওপর নানা চাপ। কমিউনিস্ট পার্টি জামাল নাসেরের সহযোগিতার জন্য একটি শর্ত আরোপ করে। তা হচ্ছে মিসর থেকে ইখওয়ানকে নির্মূল করতে হবে। ১৯৬৫ সালে ইসরাইলের মুরববী রাশিয়া থেকে নাসেরকে তলব করা হয়। পাশ্চাত্যের সেবাদাস নাসের ছুটে যায় সেখানে। ২৭ আগস্ট মস্কোয় আরব ছাত্রদের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা প্রসঙ্গে জামাল নাসের ঘোষণা করেন যে, মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অতীতে বহুবার সে ইখওয়ানকে ক্ষমা করেছে এবার আর ক্ষমা করা হবে না। মস্কো থেকে নাসের দেশে ফিরে এলেই শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। গ্রেফতার করা হয় হাজার হাজার ইখওয়ান কর্মীকে। পুনরায় গ্রেফতার করা হলো সাইয়েদ কুতুবকে। এবার গ্রেফতারী পরওয়ানা দেখে নিজেই নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, আমি জানি জালেমরা এবার আমার মাথাই চায়। তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। নিজের মৃত্যুর জন্য আমার কোন আক্ষেপ নেই। আমারতো বরং সৌভাগ্য যে আল্লাহর রাস্তায় আমার জীবনের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে। আগামীকালের ইতিহাস প্রমাণ করবে যে, ইখওয়ানুল মুসলিমিন সঠিক পথের অনুসারী ছিল, নাকি এই জালেম শাসকগোষ্ঠীই সঠিক পথে ছিল। শুধু তাকেই নয় তার ভাই মুহম্মদ কুতুব, ভগ্নি হামিদা কুতুব ও আমিনা কুতুবসহ বিশ হাজারেরও বেশিসংখ্যক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। এদের মধ্যে প্রায় সাতশ’ ছিলেন মহিলা। ইখওয়ানের প্রতি যেসব অভিযোগ আরোপ করা হয় তার প্রথমটি ছিল, ইখওয়ান একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিল- যার নেতা ছিলেন সাইয়েদ কুতুব। সংগঠনটি অভিযুক্তদের জন্য আর্থিক সাহায্য এবং অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করতো। এরা প্রেসিডেন্ট নাসেরের হত্যা পরিকল্পনা, বিশেষ ট্রেনগুলোর ধ্বংসের প্রশিক্ষণ দিত এবং এ প্রশিক্ষণ কাজে কতিপয় মহিলারও সহযোগিতা নিয়েছিল। সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়েছে শুধুমাত্র এ কারণেই কি এ অভিযোগ সমর্থন করা যেতে পারে? সাধারণ বুদ্ধির একজন লোকও প্রশ্ন করবে যে, ১৯৫৪ সালে হাজার হাজার কর্মীকে জেলে বন্দী করা হয়েছে। তাদের পরিবারবর্গ সীমাহীন দুর্দশা এবং নিঃস্ব অবস্থায় জীবন কাটিয়েছে। স্বয়ং সাইয়েদ কুতুবকে দশ বছর পর মুক্তি দেয়া হয় এবং এক বছর যেতে না যেতেই তাকে দ্বিতীয়বার গ্রেফতার করা হয়। মুক্তির পরও তাকে কড়া নজরে রাখা হয়। অথচ এটা কি করে বিবেক সায় দেবে যে, তিনি এত কম সময়ের মধ্যে এত বড় ষড়যন্ত্র কিভাবে তৈরি করলেন এবং এ জন্য এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করলেন যা সরকারের গদি ওলট-পালট করে দেবে। প্রকৃতপক্ষে এসব ছিল ইখওয়ান নির্মূলের বানোয়াট বাহানামাত্র। দ্বিতীয় অভিযোগ আনা হয় ‘মায়ালেম ফিততরীক’ পুস্তক লেখার জন্য। মিসরে সামরিক বাহিনীর একটি পত্রিকায় ১.১০.১৯৬৫ তারিখে প্রকাশিত ৪৪৬নং সংখ্যায় তার বিরুদ্ধে অতীতের অভিযোগের যে বিবরণ প্রকাশিত হয় তার সারমর্ম নিম্নরূপ। “লেখক পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সমাজ এবং মার্কসীয় মতবাদ উভয়েরই তীব্র বিরোধীতা করেছেন। তিনি দাবি করেন যে ঐসব মতবাদের মধ্যে মানবজাতির জন্য কিছুই নাই। তার মতে বতর্মান দুনিয়া জাহেলিয়াতে ডুবে গেছে। আল্লাহর সার্বভৌমত্বের জায়গায় অন্যায়ভাবে মানুষের সার্বভৌমত্ব কায়েম হয়ে গেছে। লেখক কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গীকে পুনরুজ্জীবিত করে ঐ জাহেলিয়াতকে উচ্ছেদ করার উপর জোর দেন এবং এ জন্য নিজেদের যথাসর্বস্ব কোরবানী করে দেয়ার আহবান জানান। তিনি আল্লাহ ব্যতীত সকল শাসনকর্তাদের তাগুত আখ্যা দেন। লেখক বলেন- তাগুতের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ঈমানের শর্ত। তিনি ভাষা, গাত্রবর্ণ, বংশ, অঞ্চল ইত্যাদির ভিত্তিতে ঐক্যবোধকে ভ্রান্ত আখ্যা দিয়ে ইসলামী আকীদার ভিত্তিতে ঐক্য গড়া এবং ঐ মতবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম করার জন্য মুসলিমদের উস্কানী দিচ্ছেন। লেখক তার ঐ পুস্তকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ও সমগ্র মিসরে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করা ও প্রতিটি সরকারকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা পেশ করেন।” ইখওয়ানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছিল তা ছিল বাহানামাত্র। আসল ‘ব্যাপারটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইখওয়ান নেতা ও কর্মীরা ১৯৫৪ সালের শেষভাগ থেকে জেলখানায় বন্দী জীবনযাপন করেন। রাজনৈতিক তৎপরতার কোনো চিন্তা-কল্পনা করাও তাদের অসম্ভব ছিল। তবু তাদের জ্ঞানী ব্যক্তিরা জেলখানায় অথবা জেলের বাইরে জ্ঞানগত ও চিন্তাধারার দিক থেকে দেশের অভ্যন্তরে ইসলামকে রক্ষার যতটুকু খিদমত করা সম্ভব ছিল তা তারা করেছেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তারা সাহিত্য রচনা করেছেন। মিসরে তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইসলামী ইতিহাস এবং ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ওপর বিপুল সাহিত্য বিগত দশ বছরে রচিত হয় এবং তা বিভিন্ন বিষয়ে এত বেশি ছিল যে, লোকেরা লেখকদেরকে সাহস উদ্যম প্রদান এবং প্রকাশকদেরকে প্রশংসা না জানিয়ে পারেনি। ইখওয়ান নেতা-কর্মীদের বিচার শুরু হলো বিশেষ সামরিক আদালতে। প্রথমত ঘোষণা করা হয় যে, টেলিভিশনে ঐ বিচারানুষ্ঠানের দৃশ্য প্রচার করা হবে। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিগণ ‘অপরাধ স্বীকার’ করতে অস্বীকার এবং তাদের প্রতি দৈহিক নির্যাতনের বিবরণ প্রকাশ করায় টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর রুদ্ধ দ্বারকক্ষে বিচার চলতে থাকে। আসামীদের পক্ষে কোন উকিল ছিল না। অন্য দেশ থেকে আইনজীবীগণ আসামী পক্ষ সমর্থনের আবেদন করেন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। ফরাসী বার এসোসিয়েশনের ভূতপূর্ব সভাপতি উইলিয়ম থরপ ও মরক্কোর দু’জন আইনজীবী আসামী পক্ষ সমর্থনের জন্য রীতিমতো আবেদন করেন। কিন্তু তা নামঞ্জুর করা হয়। সুদানের দু’জন আইনজীবী কায়রো পৌঁছে তথাকার বার এসোসিয়েশনে নাম রেজিস্ট্রি করে আদালতে হাজির হন। পুলিশ তাদের আদালত থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয় এবং মিসর ত্যাগ করতে বাধ্য করে। সাইয়েদ কুতুব ও অন্যান্য আসামীগণ ঊনিশ শ’ছেষট্টি সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বিচার করাকালে ট্রাইব্যুনালের সামনে প্রকাশ করেন যে, “অপরাধ স্বীকার” করার জন্য তাদের প্রতি অমানুষিক দৈহিক নির্যাতন চালানো হয়। ট্রাইব্যুনালের সভাপতি আসামীদের কোন কথার প্রতিই কর্ণপাত করেন নাই। এমনিভাবে ১৯ মে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আদালতে বিচার প্রহসন নাটক মঞ্চস্থ হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারক জামাল নাসেরের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করে ১৯৬৬ সালের ২১ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন। অভিযুক্ত ৪৩ জন নেতাকর্মীর মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এরা হচ্ছেন সাইয়েদ কুতুব, মুহাম্মদ ইউসুফ, আব্দুল ফাত্তাহ ইসমাঈল, শবরী আরাফাহ, আহমদ আবদুল মজিদ, আব্দুল আজিজ ও আলী উসমাভী। সাইয়েদ কতুবের মৃত্যুদন্ডাদেশ শোনার পর আদালত সংশ্লিষ্ট লোকজন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অথচ সাইয়েদ রায় শোনার পর খুশি মনে বলে উঠলেন, “আলহামদুলিল্লাহ”। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, “আমার কাছে এটা কোন বিষয় নয় যে, আমি কোথায় মরতে যাচ্ছি এবং কিভাবে যালিমরা আমার মৃত্যুদন্ড দেবে। আমিতো এতেই সন্তুষ্ট যে, আমি আল্লাহর একজন অনুগত বান্দা হিসাবে শাহাদতের পেয়ালা পান করতে যাচ্ছি।“ এর পরের দৃশ্য বড়ই করুণ। জয়নাব আল গাযালী লিখেছেন, মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়ার পাঁচ দিন পর সাইয়েদ কুতুব কারাগারে আটক ছোট বোন হামিদা কুতুবকে দেখতে তার কক্ষে যান। ছোট বোন তাকে দেখে বলেন, “ধন্যবাদ, প্রিয় ভাই সাইয়েদ। এটা আমার জন্য এক দূর্লভ মুহূর্ত। আপনি আমার পাশে একটু বসুন।” সাইয়েদ পাশে বসলেন। বিভিন্ন বিষয়ে অনেক আলোচনা হলো। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিলেন। হামিদা কুতুব মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ভাইকে দেখে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। কিন্তু সাইয়েদ কুতুবের সাথে কিছু কথা বলার পর হামিদা কুতুবের বিষন্ন বদনেও হাসির রেখা ফুটে উঠলো। ২৮ আগস্ট রাতে সাইয়েদ কুতুব ও তার দুই সাথীকে ফাঁসীর সেলে নিয়ে যাওয়া হলো। ২৯ আগস্ট ভোর রাত। সাইয়েদ কুতুব ও তার দুই সঙ্গীকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। ইতোমধ্যে ফাঁসির সকল আয়োজন শেষ। সাইয়েদ অত্যন্ত আনন্দিত। নির্ভীক। চিত্তে সামনে পা বাড়াচ্ছেন, তার মুখে তৃপ্তির হাসি। ছোবহে সাদেকের আলো ঝলমল ধরণী যেন আজ গভীর বেদনাপ্লুত। সাইয়েদ কুতুব হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে উঠলেন। চারদিকে ভেসে উঠল ফজরের আযান। এমনি এক পবিত্র পরিবেশে কার্যকর করা হলো ইতিহাসের ঘৃণ্যতম আয়োজন, সাইয়েদ কুতুব ও তার সঙ্গীদের ফাঁসি। সারাবিশ্বের অগণিত মানুষকে কাঁদিয়ে সাইয়েদ কুতুব পৌঁছে গেলেন তার পরম প্রিয় প্রভুর সান্নিধ্যে। পেছনে রেখে গেলেন এক বিরাট সাহিত্য সম্ভার। তার বিশেষ বিশেষ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে একাধিক উপন্যাস ও বেশ কয়েকটি শিশু সাহিত্যসহ তেফলে মিনাল কারিয়া, মদীনাতুল মাশহুর, মাশাহেদুল কেয়ামাহ ফিল কোরআন, মা’রেফাতুল ইসলাম ওয়ার রেসমালিয়াহসহ প্রায় বিশখানা গ্রন্থ। তাফসির ফি জিলালিল কোরআন- সাইয়েদ কুতুবের এক অনবদ্য অবদান। আট খন্ডে সমাপ্ত এক জ্ঞানের সাগর। তার এসব গ্রন্থাবলী ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ও নেতাদের জন্য পথনির্দেশিকা ও অনুপ্রেরণার অনন্ত উৎস হয়ে থাকবে।

সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

The curious case of Abdul Kader Molla

Mr. Abdul Qader Mollah is probably the most talked about Bangladeshi these days. The highest court in our country had ordered him to be executed through a questionable legal[1] process and in violation of international [2]and human rights [3]laws. Worrying yet is the huge pressure on the government, both from within and outside, to carry out the execution at the earliest date possible. Even the attorney general of Bangladesh has called for immediate implementation [4]of this judicial execution.
In this short note, we provide three damning arguments proving why the sentence by the Supreme-court of Bangladesh is in and of itself fundamentally flawed.
1. Retroactively sentenced: The death sentence against Mr. Mollah was handed down based on retroactively amended legislation. The International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR), to which Bangladesh is a state party, prohibits the retroactive application of criminal law1; and as such retroactively amended legislation is not valid in Bangladesh itself and clearly violates international fair trial standards.

One may question, what is wrong with it, as long as it serves a noble purpose – namely bringing the perpetrators of 1971 to justice. Well, first of all, the perpetrators of 1971 is a long story that is beyond our scope here; but suffice it to say, the whole International Crimes Tribunal (ICT) fiasco is far from bringing the perpetrators of 1971 to justice. More importantly, the end cannot justify the means in a legal context; and the practice of retroactive legislation can end up in very murky waters. For example, suppose a staunchly anti-shahbag government comes to power with two-third majority in the future, and passes a retroactive legislation making all activities related to the shahbag protest tantamount to treason! Then there would be no legal barrier to executing all those involved in shahbag movement.

2. Innocence proven beyond doubt, yet found guilty: Although Mr. Mollah’s defense team was only allowed 6 defense witnesses; they were able to prove beyond reasonable doubt[5], that Mr. Mollah was not involved whatsoever with the horrendous allegations against him. In fact, he had trained to participate in the liberation war, and was awaiting his turn in Faridpur to join the battle. He resumed his studies at Dhaka University immediately after 1971, and had later become a teacher at the Udayan school and the Rifles school in the center of Dhaka. He was also a member of the Chatra Union (Matia group) and an ex-comrade of Matia Chowdhury and Nurul Islam Nahid during his student days[6]. It seems his only crime is to have taken a principled stand in the politics of Bangladesh rather than being one of the many opportunists all around us.

3. Sentence for execution on the basis of lies and deceit: Momena Begum was about 12 or 13 when her immediate family members were brutally massacred in Mirpur, Dhaka by unknown
assailants on March 26, 1971. Up until 2007, Momena Begum, a class five graduate, had neither filed any complaints to any court of law, nor brought up the issue of her family member’s massacre to any media. Then, on 28 September 2007, she gave a statement in relation to her family’s massacre to a researcher at Jallad Khana, the annex of the Liberation War Museum officer, in which she blamed her Bihari neighbours for her family’s brutal murder[7]. Of all her family members, only she survived as she had left for her father-in-law’s place two days prior to the fatal incident. Fast forward five years, and this Momena Begum reappears in the ICT testifying that she had heard Mr. Mollah was an associate of one Akter Gunda who had killed people in Mirpur (Note: sill no allegation of Mr. Mollah’s involvement in her family’s killing). Surprisingly such a contradictory and inconclusive statement[8] was sufficient to find Mr. Mollah guilty and ‘deserving’ the death sentence!!
Worse still is the recent revelation of the fact that the Momena Begum who testified at the ICT in 2012 is not the real Momena Begum, daughter of Hazrat Ali. It was ‘someone else’ – possibly an associate of the state prosecutors – pretending to be her[9]. It has been further reported, though could not be independently confirmed, that the actual Moment Begum has been kidnapped and is being held at an unknown location by the state security forces.
The judiciary in Bangladesh does not have an exemplary record of being just and fair, especially in recent times. However, executing Mr. Mollah through such a flawed process would definitely be a new (all-time) abyss, and a disgrace to any process of law anywhere in the world. We must stand up and voice out against such a violation of the fundamental rights of a fellow Bangladeshi for the sake of Truth, Justice and our Bangladesh herself.
------------------------------ [1] http://www.hrw.org/news/2013/12/08/bangladesh-halt-execution-war-crimes-accused 2 http://www.icj.org/bangladesh-abdul-quader-mollah-death-sentence-violates-international-law/ 3 https://www.amnesty.org/en/for-media/press-releases/bangladesh-death-sentence-without-right-judicial-appeal-defies-human-rights 4 http://tinyurl.com/ozb3fzr
5 See http://bangladeshwarcrimes.blogspot.dk/search/label/Molla%20index

for detailed proceedings.
6 Confirmed by a BAL MP in one of his writings (I can’t find the reference at the moment). 7 http://www.newagebd.com/detail.php?date=2013-10-07&nid=68309#.UqSkar-D5R9

8 Justice Abdul Wahhab commented in the judgment of Mr. Mollah “PW3 (Momena Begum) in her statements made to the Investigation Officer during investigation did not implicate the accused with
the horrific incident which took place on 26.03.1973 and specifically stated that the Biharis and the Pakisan army committed the crime” - http://tinyurl.com/pfyrp7g
, pg.473 9 http://tinyurl.com/nouhhv6



আবদুল কাদের মোল্লার রায়
ট্রাইব্যুনাল ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে সংরক্ষিত মোমেনা বেগমের সাক্ষ্যে বৈপরীত্য

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসালামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে একটি অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অভিযোগটি হল মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী, তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও মেয়েদের ধর্ষর্ণের ঘটনা।

ট্রাইব্যুনাল এ অভিযোগে আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুালের এ যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

হযরত আলী পরিবার হত্যার ঘটনায় বেঁচে যায় হযরত আলী লস্করের বড় মেয়ে মোমেনা বেগম এবং এ হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের একমাত্র সাক্ষী মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে তার সাক্ষ্যে তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং তার বোনকে ধর্ষণের বিবরণ দিয়েছেন।

হযরত আলী লস্করের পরিবারের হত্যার এ ঘটনার বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। হযরত আলী লস্করের মেয়ে মোমেনা বেগমের সাক্ষাতের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ এ প্রতিবেদন তৈরি করেছিল।

এই প্রতিবেদনে দেখা যায় মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে তাদের পরিবারের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে যে বিবরণ দিয়েছেন তার সাথে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী তথ্য রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে সংরক্ষিত প্রতিবেদনে। যেমন ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ধর্ষণের ঘটনা দেখেছেন।

অথচ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে তার বরাত দিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার দুই দিন আগে মোমেনা বেগম তার শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান।

তাছাড়া ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের সময় কাদের মোল্লা ঘটনাস্থলে ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত প্রতিবেদনে কাদের মোল্লার নাম নেই।

যে হযরত আলী লস্করের পরিবার হত্যার ঘটনায় আবদুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে, হযরত আলীর বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে মোমেনা বেগমের বরাত দিয়েই সে ঘটনার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে প্রতিবেদন আকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে জাদুঘরে। প্রতিবেদনের সাথে মোমেনা বেগমের একটি ছবিও সেখানে সংযুক্ত রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ যাদু ঘরে সংরক্ষিত মোমেনার বিবরণ

১৯৭১ সালে মিরপুরের কালাপানি এলাকায় বিহারিদের সাথে কিছু বাঙালি পরিবারও বাস করতো। ৭ মার্চের পর থেকে দেশের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে কিছু কিছু বাঙালি পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। অনেকের অন্যত্র যাওয়ার অবস্থা ছিল না, ফলে ওই এলাকায় রয়ে যান। যে কয়েকটি পরিবার অন্যত্র যেতে পারলেন না তাদের মধ্যে একটি হযরত আলী লস্করের পরিবার।

হযরত আলী লস্কর ছিলেন একজন দর্জি। মিরপুরেই তার দোকান ছিল। সবাই যখন এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন হযরত আলী লস্করকেও তারা চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তার যাওয়ার জায়গা ছিল না।

২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে ২৬ মার্চ সকাল সাতটার দিকে বিহারিরা হযরত আলী লস্করের বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই তারা তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও শিশু ছেলেকে ধরে নিয়ে যায় এবং সবাইকে এক সাথে নির্মমভাবে হত্যা করে পাশের বাড়ির কূয়োতে সব লাশ ফেলে যায়।

বিহারিরা তার দ্বিতীয় মেয়ে আমেনা বেগমকে ঘরের ভেতর সারাদিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে তাকেও হত্যা করে সেই কূয়োতে ফেলে। হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম মাত্র দুইদিন আগে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ায় একমাত্র সেই প্রানে বেঁচে যায়। হযরত আলী স্ত্রী সে সময় অন্তঃসত্বা ছিলেন।

কয়েকদিন পরই এ খবর হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম জানতে পারেন। কিন্তু মিরপুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তিনি বাড়ি আসতে পারলেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ বাড়িতে এসে তিনি আর কিছুই অবশিষ্ট পেলেন না। ভগ্নহৃদয়ে ফিরে গেলেন শ্বশুরবাড়িতে।

জাদুঘরে সংরক্ষিত বিবরণে আরো জানা যায়, মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত পাম্প হাউজে এনে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পাশের ডোবায়।

১৯৯০ দশকে এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার করা হয় এবং অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে জল্লাদখানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের অংশ।

জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে যাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবারের অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন সময়ে তাদের সাক্ষাতকার ও বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষণ করেছেন।

শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের সাক্ষাতকার, লিখিত বক্তব্যের মূল কপি ও অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘরে।

ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য

ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে (রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার পরিচালনা) মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় ট্রাইব্যুনালে। ফলে সেসময় মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য সংবাদ মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশিত হয়নি। তবে মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তা আবদুল কাদের মোল্লার রায়ে বর্ণনা করা হয়েছে বিস্তারিতভাবে।

ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘটনা ঘটে। মোমেনা বেগমরা তখন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের ৫নং কালাপানি লেনে ২১ নম্বর বাসায় থাকতেন। মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে ঘটনার বিষয়ে বলেন, সন্ধ্যায় তার বাবা হযরত আলী হন্তদন্ত হয়ে ঘরে আসলেন এবং বললেন কাদের মোল্লা তাকে মেরে ফেলবে। কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সাগরেদ আক্তার গুণ্ডা তার বাবাকে হত্যার জন্য ধাওয়া করছে। তার বাবা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

এরপর তারা বাইরে বোমা ফাটাল। দরজা খোলার জন্য গালাগাল করল। তার মা দা হাতে নিয়ে দরজা খুললেন। তারা ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করল তার মাকে। কাদের মোল্লা তার বাবাকে কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। তার সঙ্গীরা তার বোন খাদিজা এবং তাসলিমার গলা কাটল। দুই বছরের ভাইকে আছড়িয়ে হত্যা করে।

মোমেনা জানান, তিনি এবং তার ১১ বছরের অপর বোন আমেনা খাটের নিচে আশ্রয় নেয়। আমেনা ভয়ে চিৎকার দেয়ায় তাকে খাটের নিচ থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে এবং এক পর্যায়ে তার কান্না থেমে যায়।

পরে তাকেও টেনে বের করে এবং ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এতে সে জ্ঞান হারায় এবং জ্ঞান ফিরে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে। তার পরনের প্যান্ট ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পান তিনি। পরে এক ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং তাদের সেবার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হন। তার শ্বশুর খবর পেয়ে তাকে এসে নিয়ে যান।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্যের বরাত দিয়ে তাদের পরিবারের ঘটনার যে বর্ণনা করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত চিত্র এটি।

ট্রাইব্যুনাল এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্টের বৈপরীত্য

ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে সংরক্ষিত প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী তথ্য রয়েছে।

যেমন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী মোমেনা বেগম তার সাক্ষ্যে বলেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। খাটের নিচে লুকিয়ে থেকে পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং তার বোনকে ধর্ষণের ঘটনা দেখেছেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেও ধর্ষণের শিকার হন এবং পরে অচেতন হয়ে পড়েন।

অপরদিকে, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত প্রতিবেদনে দেখা যায় মোমেনা বেগম ঘটনার দুই দিন আগে তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যান। ফলে তিনি প্রানে বেঁচে যান এ ঘটনা থেকে।

মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মোমেনা বেগম তাদের পরিবারের হত্যার জন্য বিহারীদের দায়ী করেছেন।

সেখানে কাদের মোল্লার কোন নাম গন্ধই নেই। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম তার জবানবন্দিতে বলছেন আবদুল কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে এবং নেতৃত্বে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কাদের মোল্লা এবং আক্তার গুণ্ডা তার বাবাকে ধাওয়া করে ঘর পর্যন্ত নিয়ে আসে। এরপর ঘরে ঢুকে তার বাবাকে শার্টের কলার ধরে বাইরে নিয়ে যায়।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় একজনমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী জীবিত সাক্ষী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলেন মোমেনা বেগম। তার সাক্ষ্যকে পাশ কাটানো যায়না বা সন্দেহ করা যায়না।

আপিল বিভাগের রায়ে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এসকে সিনহা) তার রায়ে লিখেছেন মোমেনা বেগম প্রাকৃতিক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। বর্বরোচিত এ ঘটনায় তিনি তার পরিবারের সব সদস্যদের হারিয়েছেন। তাকে আসামিপক্ষ বিস্তারিতভাবে জেরা করেছে। কিন্তু তার বর্ণিত ঘটনা এবং যেভাবে তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন তাকে আসামিপক্ষ দুর্বল করতে পারেনি।

আসামিপক্ষের দাবি

মোমেনা বেগমকে জেরার সময় আসামিপক্ষ দাবি করেছিলেন ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম নামে যাকে হাজির করা হয়েছে তিনি আসল মোমেনা নন। আসামিপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তখন তাদের কাছে এ দাবির পক্ষে ডকুমেন্ট ছিলনা। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত হযরত আলী পরিবারের হত্যার বিবরণ বেশ পরে তারা সংগ্রহ করে ট্রাইব্যুনালে জমা দেন।

এ ডকুমেন্ট ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়ার পর ট্রাইব্যুনাল তখন তা নথিভুক্ত করে জানিয়েছিলেন বিষয়টি তারা রায়ের সময় বিবেচনা করবেন। তবে ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

আপিল শুনানীর সময়ও তারা এই ডকুমেন্টটি জমা দিলে আপিল বিভাগ থেকে এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা জানতে চান এ রিপোর্ট যাদুঘরের কাছ থেকে কিভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে সে মর্মে কোনো রেকর্ড আছে কি না এবং কে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাকে তাকে হাজির করা হয়েছিল কি না।

আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এ প্রশ্নের জবাবে তখন আদালতকে বলেন, আমরা দাবি করছি আমরা যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি সেটি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এখন মাননীয় আদালত চাইলে এর সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে পারেন।

তিনি বলেন, আদালত ইচ্ছা করলে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাউকে এখানে ডেকে জানতে চাইতে পারেন তাদের কাছে এ ধরনের কোনো ডকুমেন্ট বা প্রতিবেদন আছে কি না । তাহলেই প্রমান হয়ে যাবে আমাদের দাবি সত্য কি না।

আবদুল কাদের মোল্লাকে মোট ছয়টি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় এবং এর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগে দণ্ড দেয়া হয় তাকে। হযরত আলী হত্যা ঘটনাটি ছিল ৬ নম্বর অভিযোগ এবং এ অভিযোগসহ আরো একটি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

হযরত আলী আওয়ামী লীগ করার কারণে এবং স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে আবদুল কাদের মোল্লা বিহারী এবং পাকিস্তানি সেনাদের সাথে নিয়ে তাকেসহ পরিবারের লোকজনকে হত্যা করে মর্মে অভিযোগ করা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৫ ফেব্রুয়ারি আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল আবদুল কাদের মোল্লাকে দুইটি অভিযোগে যাবজ্জীবন, তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড দেন। একই সাথে একটি অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আপিল শুনানী শেষে আবদুল কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেন।

http://www.timenewsbd.com/law---court/2013/12/09/18815#sthash.1EdJ02xW.dpuf

বিচার বিভাগীয় হত্যা মানি না , মানবো না ।









মিরপুরের কুখ্যাত কসাই কাদের আব্দুল কাদের মোল্লা হলেন যে ভাবেঃ

প্রথম চার্জটি হলো মিরপুরের শহীদ পল্লবকে হত্যা করা।

এই চার্জে রাষ্ট্র পক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী সৈয়দ শহিদুল হক মামা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিনি বলেন যে, তিনি শুনেছেন কাদের মোল্লার নির্দেশে আক্তার পল্লবকে ঠাটারি বাজার থেকে ধরে এনে মিরপুরে হত্যা করে।

কাদের মোল্লার পক্ষের সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্যদেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী শাহেরা, তিনি শহীদ পল্লবের ভাবী। তিনি বলেন, তিনি কখনও শহীদ পল্লবের হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কাদের মোল্লার নাম শুনেননি।শুধু তাই নয় তদন্তকারী কর্মকর্তা তার কোনোপ্রকার জবানবন্দি গ্রহণ না করে কাদের মোল্লার নাম জড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি জমা দেন।

এই চার্জের অন্যতম সাক্ষী শহিদুল হক মামা, যিনি ১ ও ২ নং চার্জের সাক্ষী, ২০/০৪/২০১২ ইং তারিখে বিটিভি’তে প্রচারিত ‘রণাঙ্গনের দিনগুলি’ নামক এক অনুষ্ঠানে উক্ত চার্জের ঘটনাগুলো বর্ণনা করেন। কিন্তু সে বর্ণনায় আসামীর নাম জড়িয়ে কোন ঘটনার উল্লেখ করেন নি। অথচ ট্রাইব্যুনাল উপরোক্ত চার্জে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরে কারাদণ্ড প্রদান করেন।

দ্বিতীয় চার্জে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই চার্জে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী-২: সৈয়দ শহিদুল হক মামা, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী-৪: কবি কাজী রোজী, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী-১০: সৈয়দ আব্দুল কাইয়ুম। উক্ত সাক্ষীদের কেউই জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার এই ঘটনাটি দেখেন নি এবং তারা কার কাছ থেকে শুনেছেন তাও ট্রাইব্যুনালে বলতে পারেন নি।

রাষ্ট্রপক্ষের-২ নং সাক্ষী বলেন, তিনি শুনেছেন কবি মেহেরুন্নেসাকে কাদের মোল্লার নির্দেশে হত্যা করা হয় কিন্তু তিনি কার মাধ্যমে শুনেছেন কিভাবে শুনেছেন তা আসামী পক্ষের প্রশ্নের উত্তরে জবাব দিতে পারেননি।

রাষ্ট্রপক্ষের-৪ নং সাক্ষী কবি কাজী রোজী বলেন, তিনি শুনেছেন কাদের মোল্লার নেতৃত্বে বিহারীরা শহীদ কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা করেন। কিন্তু কাদের মোল্লা কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা করেছেন কি না তিনি তা শুনেননি। অপরদিকে তার ২০১১ সালের জুন মাসে প্রকাশিত ‘শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা’ নামক বইয়ে তিনি শহীদ কবি মেহেরেুন্নেসার মৃত্যুর ব্যাপারে বিষদভাবে লিখেন। কিন্তু তিনি তার বইয়ে কাদের মোল্লার নাম কোথাও উল্লেখ করেননি।

রাষ্ট্রপক্ষের-১০ নং সাক্ষী বলেন শহীদ কবি মেহেরেুন্নেসাকে হত্যা করেছে বিহারী এবং এই হত্যার ব্যাপারে তিনি কোনোভাবেই কাদের মোল্লাকে জড়িত করেননি। এই চার্জে প্রসিকিউশন তাদের মামলা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যার্থ হয়েছে তা সত্ত্বেও কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

তৃতীয় চার্জে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আইনজীবী খন্দকার আবু তালেব হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই চার্জে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের-৫ নং সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান এবং রাষ্ট্রপক্ষের-১০ নং সাক্ষী সৈয়দ আব্দুল কাউয়ুম। তারা উভয়ে শোনা সাক্ষী এবং তারা কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেনি খন্দকার আবু তালেব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আব্দুল কাদের মোল্লা জড়িত।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে মিরপুরের জল্লাদখানায় সংরক্ষিত শহীদদের জীবনী এবং শহীদ পরিবারের বিভিন্ন জনের জবানবন্দী সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা আসামী পক্ষ সংগ্রহ করে বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়।

উক্ত জবানবন্দীতে দেখা যায় রাষ্ট্রপক্ষের-৪ নং সাক্ষী কাজী রোজী তার লেখা বই ‘শহীদ কবি মেহেরুন্নেছা’তে খন্দকার আবু তালেব হত্যার জন্য বিহারী হালিমকে দায়ী করেন। সেখানে তিনি কেন আব্দুল কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ করেননি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “কাদের মোল্লার ভয়ে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।”

আইনজীবীগণ প্রশ্ন করেন, “আপনার বই প্রকাশ হয়েছে ২০১১ সালে আর আব্দুল কাদের মোল্লা গ্রেফতার হন ২০১০ সালে তাহলে তিনি কিভাবে আপনাকে ভীতি প্রদর্শন করলেন?” রাষ্ট্র পক্ষের সাক্ষী কাজী রোজি এর কোন জবাব দিতে পারেননি। অথচ মাননীয় ট্রাইব্যুনাল শুধুমাত্র শোনা সাক্ষীর উপর ভিত্তি করে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।

পঞ্চম চার্জে পল্লবীর আলোবদি গ্রামে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে। এই চার্জে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের-৬ নং সাক্ষী শফিউদ্দিন মোল্লা এবং রাষ্ট্রপক্ষের-৯ নং সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা। রাষ্ট্রপক্ষের-৬ নং সাক্ষী তার প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেছেন, ঘটনার আগে তার পুরো পরিবার প্রাণভয়ে সাভারস্থ সারুলিয়া গ্রামে চলে যায়। তিনি না গিয়ে ঘটনার দিন পার্শ্ববর্তী ঝোপ থেকে আব্দুল কাদের মোল্লাকে গুলি করতে দেখেছেন।

অপরদিকে তার আপন ছোট ভাই (আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষের-৫ নং সাক্ষী)আলতাফ উদ্দিন মোল্লা বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন যে, ঘটনার পূর্বে তাদের পুরো পরিবার পালিয়ে গিয়েছিল সাভারস্থ সারুলিয়া গ্রামে এবং তার বড় ভাই শফিউদ্দিন মোল্লাও তাদের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সুতরাং তার ঘটনা দেখার কোনো প্রশ্নই আসে না এবং তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের-৯ নং সাক্ষী আমির হোসেন মোল্লা মিরপুর এলাকার ‘লাট ভাই’ হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৩ ডিসেম্বর ২০০১ ইং তারিখে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। শুধু তাই নয় ১৫/০৫/২০১২ ইং তারিখে হাইকোর্ট বিভাগের বর্তমান একজন বিচারপতির জায়গা দখলের অভিযোগে সম্প্রতি কারাভোগ করেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমিদখল এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে শতাধিক মামলা বিচারাধীন আছে। তিনি ২৫/০১/২০০৮ ইং তারিখে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। যে মামলায় তিনি অভিযোগ করেছিলেন নিজামী, মুজাহিদ এবং কাদের মোল্লা আলোবদি গ্রাম আক্রমণ করে এবং ঘটনার সময় সে দুয়ারীপাড়াস্থ এক ডোবায় আশ্রয় নেয় যা আলোবদি গ্রাম থেকে ৪ মাইল দূরে অবস্থিত।

অথচ ২৬/০৮/২০১২ ইং তারিখে তিনি ট্রাইব্যুনালে এসে বলেন ঘটনার সময় তিনি আলোবদি গ্রামে ছিলেন এবং ঘটনার সময় তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাকে গুলি করতে দেখেছেন।

ষষ্ঠ চার্জে প্রসিকিউশন জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে হযরত আলী লসকর এবং তার পরিবারকে হত্যার ব্যাপারে অভিযোগ আনেন, যার একমাত্র সাক্ষী হলো মোমেনা বেগম রাষ্ট্রপক্ষের-৩ নং সাক্ষী। তিনি বলেন যে, তিনি কাদের মোল্লাকে দেখেননি। জনৈক কামাল ও আক্কাস মোল্লার কাছ থেকে শুনেছেন যে, তার বাবাকে কাদের মোল্লা হত্যা করেছে।

একই সাক্ষী মোমেনা বেগম তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা বিষয়ে ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছেন, ঘটনার দুই দিন আগে তিনি শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান।

কোর্টে বলেন, ঘটনাস্থলে তিনি উপস্থিত ছিলেন আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত বক্তব্যে দেখা যায় তিনি ঘটনার দুই দিন আগে শ্বশুর বাড়ি চলে যান।

অথচ ট্রাইব্যুনাল উক্ত অভিযোগে মাত্র একজন সাক্ষীর মুখ থেকে শুনে আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।

আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষ থেকে তার সাক্ষী-২ সুশীল চন্দ্র মণ্ডল ট্রাইব্যুনালে এসে বলেন যে, জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা স্বাধীনতার পুরো সময় ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ফরিদপুরের সদরপুর গ্রামে ছিলেন এবং সেখানকার ধলা মিয়া পীর সাহেবের বাড়িতে থেকে তার সন্তানদের পড়াতেন।

আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষের-৩ নং সাক্ষী মোসলেম উদ্দিন আহমেদ যিনি ফরিদপুরে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনিও বলেন কাদের মোল্লা সাহেব স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো সময় ফরিদপুরের সদরপুরে ছিলেন এবং ধলা মিয়া পীর সাহেবের ছেলে মেয়েদের পড়াতেন ।

এবং আব্দুল কাদের মোল্লার পক্ষের ৬ নং সাক্ষী জনাব হাফেজ এ, আই, এম লোকমান যিনি ১৯৭১ সালে শহিদুল্লাহ হলের ইমাম ছিলেন এবং যে হলে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা থাকতেন। তিনি বলেন যে, ৭ই মার্চের পর তিনি জনাব আব্দুল কাদের মোল্লাকে হল ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে দেখেছিলেন এবং কাদের মোল্লা ১৯৭২ সালের শেষের দিকে বাড়ি থেকে আবার প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।

আব্দুল কাদের মোল্লা কে ১৩ই জুলাই ২০১০ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গন থেকে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে পল্লবী থানার মামলা নং-৬০(১)০৮ এবং কেরানীগঞ্জ থানাধীন মামলা নং-৩০(১২)০৭ এ গ্রেফতার দেখায়। এরপর ২২শে জুলাই ২০১০ তারিখে আইসিটিবিডি মিস কেস নং-০১/২০১০ এ কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে আটক রাখা হয় যার কারণে ‘‘ইউএন ওয়ার্কিং গ্রুপ অব আর্বিট্রেরি ডিটেনশন’’সহ আরো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহ তাকেসহ অন্যান্য জাতীয় নেতৃবৃন্দকে দ্রুত মুক্তি দেয়ার জন্য বর্তমান সরকারকে আহবান জানায়।

১৯৭২ সালের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে হলে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।

তিনি ১৯৭৪-৭৫ সালে উদয়ন স্কুলের শিক্ষক ছিলেন – যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র জগন্নাথ হল ও সলিমুল্লাহ হলের মাঝামাঝি অবস্থিত।

১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে সিনিয়র শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন।

কোনো হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকলে তিনি সত্তরের দশকের এ উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকে অধ্যায়ন করা এবং ঢাকা শহরের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকতে পারা কিভাবে সম্ভবপর হয় যৌক্তিক কারণে সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

দালাল আইনে ৩৭ হাজার লোকের নামে মামলা করা হলেও তখন তার নামে কোথাও একটি জিডিও করা হয়নি।

৪২ বছর পর বর্তমান সরকার মানবতাবিরোধী বিচারের নামে মিরপুরের কসাই কাদেরকে কাদের মোল্লা হিসাবে চিহ্নিত করে মামলা দিয়ে বিচারের মাধ্যমে দন্ডাদেশ প্রদান করেছে যা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের চরম লংঘন হবে কারন মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। উল্লেখ্য ইতিমধ্যে ডিফেন্সের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক,কাদের মোল্লার বড় ছেলে হাসান জামিল,সুশিল সমাজের বিশাল একটি অংশ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিদেশী আইনজ্ঞরা এই ট্রাইব্যুনালের প্রতিটি রায়কে জুডিশিয়াল কিলিং হিসাবে আখ্যা দিয়েছে।

রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৩

!!! মৃত্যু পরোয়ানা !!!

!!! মৃত্যু পরোয়ানা !!!

আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে এই বিশ্বজগতের একমাত্র মালিক , সকল ক্ষমতার উৎস মহান রাব্বুল আলামিন মৃত্যু পরোয়ানা জারী করেছিলেন প্রত্যেক মাখলুকাতের জন্য ।

সকল সৃষ্টিই মরণশীল, অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সকল সৃষ্টি একদিন ধ্বংস হইবে , প্রত্যেক জীবনেকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হইবে । আর এটাই সঠিক এবং সত্য মৃত্যু পরোয়ানা ।

আজ যারা কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জারী করে খুশি হচ্ছেন , তারা কি জানেন তাদের মৃত্যুর পরোয়ানাও তাদের ঠিক গাঢ়ের উপর এসে উপস্থিত হয়েছে ।

পরোয়ানা দেওয়ার মালিক তো আল্লাহ । আর আল্লাহ সেটা ১৪০০ বছর আগেই করে দিয়েছেন ।

যার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারী করা হলো , তিনি তো আগের থেকে আল্লাহর প্রেরিত পরোয়ানা পেয়ে গেছেন , তাই  ----
ফাঁসির রায়ের পর আব্দুল কাদের মোল্লাকে রায় শুনানোর পর মৃত্যুদন্ডের কথা শুনে প্রথমেই তিনি বলে ওঠেন 'আলহামদুলিল্লাহ ............. আলহামদুলিল্লাহ
আলহামদুলিল্লাহ রাব্বুল আলামীন'।

অর্থাৎ একজন বীর ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে , জালেমের আঘাতে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়াকে নিজের সফলতা বলে খুশি হচ্ছেন । শহীদ হয়ে আল্লাহর কাছে যাওয়া একজন ঈমানদারের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ।

জনাব কাদের মোল্লাকে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি  দৃঢ় এবং ব্জ্র কণ্ঠে বলেন , "  "আপিলের রায়ের পর রিভিউ করা হোক বা না হোক আমি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবনা এটাই আমার সিদ্বান্ত।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবুওয়াতের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন কিন্তু শাহাদাতের দরজা খুলা রেখেছেন। যতদিন ইসলামী আন্দোলনে শাহাদাতের ঘটনা ঘঠবে ততদিন ইসলামী আন্দোলন বেগবান হবে, আল্লাহ যাদেরকে চান তাদেরকেই শহীদ হিসেবে কবুল করেন।
আমি যদি মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ হিসেবে অন্তভুক্ত হই, সেটাই হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পাওনা। সুতরাং, মৃত্যুদন্ডের ভয়ে আমি ভীত নই। আসল ফয়সালা হবে আখেরাতের আদালতে।
 আজকের বিচার সেদিন আমার মুক্তির কারণ হবে। মহান আল্লাহর কাছে আমি সেদিন অবশ্যই ন্যায় বিচার পাবো।
আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও এদেশের মানুষ একদিন মুক্তি পাবে। আল্লাহর দ্বীন এখানে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল জুলুমের অবসান ঘটবে। আমি মহান আল্লাহর কাছে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় কামনা করছি"।

শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৩




বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার

পুরো বিচারব্যবস্থার অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: টবি কেডম্যান

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে বুদ্ধিজীবী হত্যা মমলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের আইনজীবী মানবাধিকার কর্মী বৃটিশ নাইন বেড ফোর্ড রো ইন্টারন্যাশনালের এস্ট্রাডাইট (দেশে ফেরত) বিশেষজ্ঞ টবি কেডম্যান বলেছেন, আইনানুযায়ী মুঈনুদ্দীনকে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ষড়যন্ত্রে সরকার সফল হবে না।

একই সাথে তিনি বলেছেন, খুব শিগগিরই এই সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রিভিউর মাধ্যমে পুরো বিচার ব্যাবস্থার অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ১০ নম্বর ডাউনিং ষ্ট্রীটের সম্মুখে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ ৭১টি সংগঠন যৌথভাবে চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে দেশে ফেরত দেয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেন।

মানববন্ধনে মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন ভূমিকা ও হত্যা, ধর্ষণ, নারী অপহরণ, আগুন দেয়াসহ সাক্ষ্য প্রমাণসহ স্মারকলিপি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বরাবর পেশ করেন।

উল্লেখ্য, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন দাওয়াতুল ইসলাম ইউকে আই আরের সাবেক সভাপতি, বহুল পরিচিত চ্যারিটি সংগঠন মুসলিম এইডের ট্রাস্টি। এছাড়া ব্রিটিশ প্রিন্স চার্লসের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবে পরিচিত সকলের কাছে।

মুঈনুদ্দীনকে নিয়ে নানা রকম আলোচনা দেশে-বিদেশে। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কিনা- এমনই এক পরিস্থিতিতে তার আইনজীবী টবি কেডম্যানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কোন ব্রিটিশ নাগরিকের কোন দেশ তার অনুপস্থিতিতে করবে, আর বৃটেন তার নাগরিককে ওই জল্লাদদের হাতে অর্পণ করবে এটা হয় না।

তিনি বলেন, আমি আমার মক্কেলের পক্ষে মামলার পরিচালনার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে গেলে সরকার আমাকে মামলা পরিচালনা করতে না দিয়ে ফেরত আসতে বাধ্য করে। এ পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকারের মনে এই মমলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর তাছাড়া ব্রিটেন তাদের নাগরিককে কোন দেশ মৃতুদণ্ড দিলে সেক্ষেত্রে তাকে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নই উঠে না।

তিনি বলেন, আমার মক্কেলকে এমন একটা ট্রাইব্যুনাল শাস্তি দিয়েছে যা নিয়ে সারা বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার জড় বইছে। সেক্ষেত্রে তাকে ফেরত পাঠানো যায়না। তাছাড়া তিনি (মুঈন) এখন আর বাংলাদেশের নাগরিক নন। তিনি এখন সম্মানিত ব্রিটিশ নাগরিক।

মুঈনুদ্দীনকে বাংলাদেশ ফেরত নেয়ার জন্য কোন আবেদন করেছে কিনা জানকে চাইলে টবি বলেন, বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কোন আবেদন করেনি-এটা আমি নিশ্চিত।

তিনি বলেন, আন্ডার দ্য এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট-২০০৩ অনুযায়ী যতক্ষণ বাংলাদেশ কোন আবেদন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনভাবে দেশে ফেরত নেয়ার কথা গ্রহণযোগ্য হবে না ।

টবি বলেন, বাংলাদেশী দুজন ব্যারিস্টার বলেছেন, স্মারকলিপি দিয়ে, মানববন্ধন করেই মুঈনকে ফেরত নেয়া যাবে।আমি মনে করিনা সেভাবে সম্ভব হবে।

কেডম্যান বলেন, এ ক্ষেত্রে দুটি বাধা আছে। তাহলো-

প্রথমত, বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যে ফেরতের কোন চুক্তি নেই। এ ক্ষেত্রে একটি আইন আছে তা আবার ব্রিটিশ এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট ২০১৩। এই আইনেও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ১. যেখানে মৃত্যুদণ্ডের মতো মারাত্মক ঝুঁকি আছে, সেক্ষেত্রে ব্রিটেন তাদের নাগরিককে কখনোই হস্তান্তর করবে না।

তাছাড়া যে ট্রাইব্যুনালে ন্যায় বিচার অনুপুস্থিত, মানবাধিকারের লঙ্ঘন করে কারাগারে পাঠানো হয় সেখানে ব্রিটিশ নাগরিককে হস্তান্তর করা অনেক চ্যালেঞ্জের। যদি তা করা হয় তাহলে ইউরোপিয়ান কনভেনশন অ্যাক্টের ধারা তিনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে আইনী বাধার কারণেও আর মুঈনকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা নাই।

টবি বলেন, দ্বিতীয় কারণটি হলো যদি এধরনের কোন আবেদন বাংলাদেশ সরকার করেও, তারপরেও এতে কোন শর্ট-কাট ব্যবস্থা নেই। এছাড়া যদি ব্রিটিশ সরকার ফেরত দিতে সম্মতিও হয়, তাহলেও অনেক সময় লাগবে। বছরের পর বছর না লাগলেও মাসের পর মাসতো লাগবেই।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদি ব্রিটিশ সরকারের সাথে বিশেষ চুক্তিও করে ফেলে তারপরেও বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন অ্রাক্ট ২০১৩ এবং ইউরোপিয়ান কনভেনশন অ্যাক্ট অনুযায়ী সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, আমি আমার মক্কেলের দেশে ফেরত নিয়ে উদ্বিঘ্ন নই। আমার মক্কেল সব ধরনের আইনি পদক্ষেপের কথাই চিন্তা ভাবনা করছেন। আর তিনি সে অনুযায়ীই তার কাজ করে চলেছেন। তিনি এই মিথ্যা মামলার করণে উদ্বিঘ্ন নন।

টবি বলেন, শুধু মাত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধায়নেই ন্যায় বিচার হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার যদি আমার ক্লায়েন্টের ব্যাপারে সত্যি নিশ্চিত হয়ে থাকেন তিনি অপরাধী তাহলে আন্তর্জাতিক আইনে ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে বিচারের ব্যবস্থা করতে পারে।

তিনি বলেন, আমার মনে হয় এ সরকার তা কখনোই করবে না। অধিকার ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাথে সরকারের আচরণে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।

ইংল্যান্ডের কারাগারে সাজা কাটানোর প্রসঙ্গে টবি বলেন, এই বিষয়টি প্রথম ৯০ সালে প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল। তখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস, মেট্রোপলিটন পুলিশ, এফসিও লিগ্যাল ডিপার্টম্যান্ট মঈনুদ্দীনের ব্যাপারে কোন অভিযোগ নথি পত্রে প্রমাণিত না হওয়ায় কোন কোন অভিযোগ না করার সুপারিশ করা হয়েছিলো।









তিনি বলেন, যেহেতু তার অনুপস্থিতিতে এ রায় দেয়া হয়েছে, এমতাবস্থায় ব্রিটিশ আদালত রোল্ড আউট করতে পারে না। ডাবল জিওপার্ডিহেতু প্রসিকিউশন মঈনুদ্দীনকে ব্রিটেনের আদালতে নিয়ে বিচারের জন্য সমন জারি নাও করতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অ্যাক্টস থ্রোতে এই রায় নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি- এমন প্রশ্নের জবাবে টবি বলেন, এ রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং আন্তর্জাতিক আইন মানা হয়নি। রায় হয়েছে অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে-এটাই ফ্যাক্টস, যা অনেকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের পরপরই এটা নিয়ে পুরোপুরি রিভিউ করা হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায়। যেহেতু এই রায় এর কার্যক্রম নিয়ে অনেক সন্দেহ ও নানা অসংগতি রয়েছে। আমার বিশ্বস আমার দুই মক্কেলই(মুঈন-আশরাফ) আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সহায়তায় পরিপূর্ণ রিভিউর মাধ্যমে সম্মানের সাথে মুক্ত হবে এই সাজা থেকে।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মনে করি ট্রাইব্যুনালের পুরো বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্ন বিদ্ধ তাই এই বিচার আবার নতুন করে শুরু করা প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৩

শুধুমাত্র ইসলামী রজনীতি করার কারণেই আব্দুল কাদের মোল্লা আজ একপা দুপা করে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাছেন!



শুধুমাত্র ইসলামী রজনীতি করার কারণেই আব্দুল কাদের মোল্লা আজ একপা দুপা করে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাছেন!

আব্দুল কাদের মোল্লা একটা নাম, একটা জীবন্ত ইতিহাস। তিনি মেধাবী একজন ছাত্র হিসেবে ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনিষ্টিটিউট থেকে প্রথম শ্রেণীতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরিক্ষায় উত্তীর্ন হন। ১৯৬৮ সালে তিনি একই কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কারনে ১৯৭১ সালে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষা না দিয়ে ১৯৭৫ সালে তিনি সামাজিক বিজ্ঞানে শিক্ষা প্রশাসনের ডিপ্লোমায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে আবার ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রীতে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হন।

আব্দুল কাদের মোল্লা ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকার বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এম,এড পরীক্ষার রেজাল্টের পরে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন এবং পরে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ সংস্কৃতি কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে রিসার্স স্কলার হিসাবে বাংলাদেশ ইসলামী সেন্টারে যোগ দেন। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে মোল্লা দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে সাংবাতিকতার সাথে যুক্ত হন। ১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে সে পরপর দুই বছর ঢাকা ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (ডি ইউ জে) এর সহসভাপতি নির্বাচিত হন।

অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যায়নকালেই তিনি কম্যূনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্রইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার পর মাওলানা মওদূদী(রঃ) লিখিত তাফহীমুল কুরআন পড়ে আলোকিত জীবনের সন্ধান পেয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে তিনি ছাত্রসংঘের তৎকালিন পূর্বপাকিস্তান শাখায় যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি এ সংগঠনের সদস্য হন। ছাত্রসংঘের শহিদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি, ঢাকা বিশব্বিদ্যালয় শাখার সভাপতি, ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারী ও একই সাথে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ছাত্রইউনিয়ন তাকে রাজনীতি শিখাল অথচ তিনি ১৯৬৬ সালে ছাত্র সঙ্ঘে এবং ১৯৭৭ সালের মে মাসে জামায়াতে যোগ দেন এবং ১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসে রুকন হন যা বাতিলের মাথা ব্যাথার অন্যতম কারণ। ধিরেধিরে তিনি গোলাম আযমের ব্যাক্তিগত সেক্রেটারি এবং ঢাকা মহানগরীর শূরা সদস্য ও কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অল্পদিনের ব্যাবধানেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশ-এ-শূরার সদস্য হন। ১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারী ও পরবর্তীতে ঢাকা মহানগরীর নায়েব-এ-আমীর এবং ১৯৮৫ সালে তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রিয় কর্মপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

তিনি ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ২০০০ সালে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেলে হিসেবে মনোনীত হন। উক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি আওয়ামীলীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে তিনি চারদলীয় জোটের লিয়াজো কমিটির গুরুত্বপূর্ন সদস্য হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন।

মোল্লাকে বিভিন্ন মেয়াদে চার চারবার জেলে যেতে হয়। আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়ে ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মত তিনি বাম রাজনীতিক হিসেবে গ্রেপ্তার হন। ১৯৭২ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন কিন্তু স্থানীয় জনতার বিক্ষোভের মুখে পুলিশ তাকে স্থানীয় পুলিশ স্টেশন কাস্টোডী থেকেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়! জেনারেল এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারনে আব্দুল কাদের মোল্লাকে আবারও আটক করে রাখা হয়। পরে উচ্চ আদালত তার এ আটকাদেশকে আবৈধ ঘোষণা করলে চারমাস পরে তিনি মুক্ত হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করায় তৎকালীন বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তাকে আটক করে।

মোল্লা সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংস্থার সাথে যুক্ত। যার মধ্যে বাদশাহ ফয়সাল ইন্সটিটিউট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন সোসাইটি ও এর স্কুল, সদরপুর মাদরাসা ও এতিমখানা, ফরিদপুর জেলার হাজিডাঙ্গি খাদেমুল ইসলাম মাদরাসা ও এতিমখানা, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী একাডেমী অন্যতম। এছাড়াও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন।

মোল্লা দেশ বিদেশের সমসাময়িক বিষয়ের উপর একাধিক কলাম ও প্রবন্ধ লিখেছেন। ইসলামের বিভিন্ন দিকের উপরো তার লেখা পাওয়া যায়। তার লেখা কলাম ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও বস্তুবাদ ও কম্যূনিজমের উপরে তার বৈজ্ঞানিক সমালোচনা শিক্ষিত মহলের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

মোল্লা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন যার মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান ও ভারতে ভারত অন্যতম।

এহেন বর্নাড্য জীবনের অধিকারী একজন ব্যাক্তিকে শুধুমাত্র ইসলামী রজনীতি করার কারণেই আজ একপা দুপা করে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে হছে! তিনি যদি সত্যিকারেই যুদ্ধাপরাধী হতেন তাহলে ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন, উদয়ন স্কুলে শিক্ষকতা, রাইফেলস কলেজে অধ্যাপনা এমনকি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ অলঙ্কৃত করতে পারতেন না। দেশের গুণীজনদের আড্ডাখানা প্রেসক্লাব কেন্দ্রিক ঢাকার সাংবাদিকদের প্রেস্টেজিয়াস ইউনিয়ন, ‘ঢাকা ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (ডি ইউ জে)’ এর পরপর দুই মেয়াদ ১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে সহসভাপতি নির্বাচিত হতে পারতেন না। তিনি যে যুদ্ধাপরাধী না তার অন্যতম প্রমাণ হল যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকার, আল বদর, আল শামস হিসাবে কোন তালিকায় তার নামতো দূরের কথা সন্দেহ ভাজনের তালিকায়ও নাম ছিলনা। এমনকি এধরণের অপরাধে তাকে কেউ ইতিপূর্বে অভিযুক্তও করেনি। এমন একজন নিষ্কলুষ ব্যক্তিকে নিয়ে শুধু মাত্র রাজনীতির কারনেই এই মরণ খেলা।
সরকার মনে করছে এই মরণ খেলা খেলে এবং অবৈধ চাপ প্রয়োগ করে জামায়াতকে কাবু করা যাবে কিন্তু তথ্য বাবার সে আশায় গুড়ে বালি। যারা নিজের মাথা পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে তারা দুনিয়ার কোন অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনা। তথ্য বাবাদের কাছে ইসলামী আন্দোলনের কোন নেতা তো দূরের কথা কোন সমর্থকও নতি স্বীকার করবেনা ইনশা’আল্লাই।
ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের দৃঢ় মনোবলের কাছে শেষ পর্যন্ত ধর্মহীন সেকুলারদের পরাজিত হতেই হবে ইনশা’আল্লাহ। ক্ষণিকের জন্য হয়ত প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, কিছু নিরপরাধ মানুষকে খুণ করতে পারবে, তবে তাতে অঙ্কুরেই তথ্য বাবার হাত রক্তে রঞ্জিত হবে, যা তার নানা করেছিল পরিণত বয়সে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় তার নানা যেখানে ক্ষমতা চর্চ করতে গিয়ে সিরাজ শিকদারের রক্তে নিজের হাত রঞ্জিত করে জাতির কাছে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিল সেখানে রাজনীতির মাঠে হাতি খড়ি নিতে না নিতেই তথ্য বাবা কলঙ্কিত হবে। সে ক্ষেত্রে তাকে বাংলার জনগণ তার নানার আসনে বসাবে নাকি ইসলাম বিদ্বেষী ভিনদেশী দালাল হিসেবে চিহ্নিত করে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছু দিন আপেক্ষা করতে হবে।